রবিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২২

ড. জ্যোৎস্নালিপি

সম্পাদক

প্রয়াত কামরুল হাসান মঞ্জু

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক

পটভূমি
আধুনিক সাংবাদিকতার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া নিরপেক্ষতা এবং বস্তুনিষ্ঠতার দিক দিয়ে সংবাদপত্রগুলোতে যোগ করছে নতুন মাত্রা। এই ধারায় বংলাদেশে নতুন সংযোজন অনলাইন প্রত্রিকা। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের আওতায় গ্রামের সাধারণ মানুষেরও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যসেবা পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সংবাদপত্র যেখানে এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া সময় সাপেক্ষ ও ব্যায়বহুুল ব্যাপার, সেখানে মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার ব্যাবহার করে দেশ-বিদেশের খবর জানা সম্ভব হচ্ছে।

আর এই সহজ কাজটিই করে দিচ্ছে অনলাইন পত্রিকা। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে সংবাদপত্রের গুরুত্ব খানিকটা হলেও ভাটা পড়তে শুরু করেছে। মানুষের হাতে মোবাইল ফোন সহজলভ্য হওয়ায় সময়ের প্রয়োজনেই মানুষ অনলাইন পত্রিকার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সংবাদ বা অন্যান্য তথ্য দেখার জন্য যেখানে আলাদাভাবে সময় বের করে টেলিভিশনের সামনে বসতে হয়, সেখানে ইচ্ছে করলেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারাবিশ্বের তথ্য মুহূর্তেই জানা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহার বাংলাদেশের সংবাদপত্র শিল্পকে দিতে পারে এক নতুন মাত্রা।

ব্যতিক্রমি কেন
অন্যান্য পত্রিকা থেকে এই অনলাইন পত্রিকাটি হবে ব্যতিক্রমি। বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতে জনমানুষের সংবাদ বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত। দেশের প্রধান ধারার সংবাদপত্রগুলো মূলত এলিট শ্রেণী, রাজনীতি এবং বাজারের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। নগরকেন্দ্রিক সংবাদ ছাপিয়ে পত্রিকার পাতায় গ্রামের জীবন-সমস্যা এবং কণ্ঠস্বর খুব কমই প্রতিভাষিত হয়। গ্রামের মানুষের সমস্যা সমাধান এবং স্বপ্ন নির্মাণকল্পে সাংবাদিকতায় স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠা জরুরি।

সুতরাং ইস্যু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নগরের চেয়ে আমরা গ্রামকেই বেশি প্রাধান্য দেব । সব সময়ই অজ্ঞানতা, বঞ্চনা ও নিগ্রহের শিকার হয় গ্রামের মানুষ। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যাঁতাকলে নিষ্পেষিত এসব মানুষেরা চিরকালীন নির্যাতনের শিকার হতে হতে কোনদিনই মুক্তির পথে আসবে না, যদি তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে অসচেতন থাকে। আর এ দায়বোধ থেকেই সেইসব মানুষের গাথা শোনাতে হাতে কলম তুলে নিতে হবে। আর সেই ধারণা বোধ থেকেই আমরা এই অনলাইন পত্রিকাটির যাত্রা সূচনা করতে চাই। অর্থাৎ প্রচলিত সাংবাদিকতার ধারা থেকে বাইরে এসে জনমানুষের উপযোগী করে এক বিকল্প ধারার সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু করতে চাই।
মাটি ও মানুষের কথা তুলে ধরতে এক আদর্শিক জায়গা থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে যাত্রা শুরু হয়েছিলো সংবাদপত্রের। কালক্রমে সংবাদপত্রের বিকাশের সাথে সাথে তার রূপের বদল ঘটতে থাকে। আদর্শিকতার জায়গা দখল করে পুঁজিবাজারের পণ্যে পরিণত হয় সংবাদপত্র। জন্মলগ্ন থেকে যার স্বপ্নই শুরু হয়েছিলো গণমানুষকে কেন্দ্র করে তার এ রূপের বদল আমাদের ভাবারই বিষয়। তবে হতাশাকে পাশ কাটিয়ে কিছু মানুষ এখনও এই সংবাপত্রশিল্পকে একটা আদর্শিক জায়গায় রাখার সংগ্রমেরত।
সাধারণত বেশিরভাগ গণমাধ্যম একপেশে সংবাদ বেশি প্রকাশ করে। গ্রাম ও নগরের সংবাদ ভারসাম্যভাবে তুলে ধরা হয় না বললেই চলে। আমরা মূলত এর থেকে বাইরে এসে জনমানুষের কল্যাণে জনসাংবাদিকতার চর্চা করতে চাই।

উদ্দেশ্য
গ্রামের মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে তুলে আনবে আমাদের অনলাইন সাংবাদিকতা। সংবাদ যে শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামের মানুষেরাও যে কাগজের মানুষে পরিণত হতে পারে, তার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে কাজ করবে একঝাঁক সাংবাদিক। বেশিরভাগ গণমাধ্যম মূলত এলিট শ্রেণীর কথা এবং রাজনীতি অথবা পুঁজি-স্বার্থে বিজ্ঞাপন প্রচারে সবসময়ই সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এই ধারার বাইরে এসে সাংবাদিকতার নতুন ধারা নির্মাণে সচেষ্ট হওয়াসহ গড়ে তুলবো সাংবাদিকতার এক নতুন অধ্যায়। আমরা মূলত জনসাংবাদিকতার চর্চা করতে চাই।

ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণী, নির্বিশেষে যেকোনো এলাকার অর্থাৎ শুধু গ্রাম নয়, সমস্যা সংকুলিত মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা ও সৃষ্ট জননীতি না থাকার ফলে জনগণের জীবনে কখনও কখনও সমস্যার সৃষ্টি হয়, আর এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা সম্ভব বা সমাধানের স্থায়ী রূপ কীভাবে দেওয়া যায় কোন সাংবাদিক যখন সেই লক্ষ্যেই কাজ করে তা হয় জনসাংবাদিকতা।

অর্থাৎ জনসাংবাদিকতা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করে এবং তা একটা সমাধানের দিকনির্দেশনা দেবে। জনসাংবাদিকতা মূলত জনসাধারণের ইস্যুগুলোকে সমাধানের ইঙ্গিত দেয়। জনসাংবাদিকতা তথ্যের মাধ্যমে মানুষকে ক্ষমতায়ন করার প্রক্রিয়া। পরিবর্তনের সাথে অভিযোজিত হতে গেলে নতুন জ্ঞান, দক্ষতা এবং সক্ষমতার প্রয়োজন। এই ধারার সাংবাদিকতা জনমানুষের মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা এবং স্বপ্নের সঞ্চারণ ঘটিয়ে নতুন সময়ের জন্য সক্ষম করে তোলে। যা কিছু প্রান্তিক তার সব ফেলনা নয়। জনমানুষের জ্ঞান, স্মৃতি, দর্শন, দক্ষতা, সম্প্রীতি, আধ্যাত্মিকতা, সঙ্গীত, শিল্প, আচার, পার্বণ সবই মূল্যবান সামাজিক উপাদান। এগুলোর সাথে নতুন সময়ের জ্ঞান সক্ষমতার সম্মিলন ঘটানোই জনসাংবাদিকতার আরাধ্য।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশির দশকের মাঝামাঝি একদল সাংবাদিকের সংবাদ-চর্চায় প্রচলিত ধারার সাংবাদিকতার অচলায়তন ভাঙার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। তাদের সেই বৈপ্লবিক চেষ্টার মধ্যেই নিহিত ছিল জনসাংবাদিকতার দর্শন।

বাংলাদেশে এ ধারার সাংবাদিকতার বিকাশ সম্পর্কে বলা যায়, এখনো এর তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দাঁড়ায়নি। রিপোর্টিংয়ের ক্ষেত্রে এদেশে উৎস, স্থান, ঘটনা, সংবাদ-কাঠামো ইত্যাদির পক্ষপাতিত্ব রয়েছে । অথচ এদেশের অধিকাংশ মানুষ প্রান্তিক। উন্নয়ন তখনই সম্ভব হবে যখন প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করা যাবে। আর এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের রয়েছে বিশাল ভূমিকা। জনসম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ উঠলে জনসাংবাদিকতার বিষয়টি সামনে চলে আসে অনিবার্যভাবে। যদিও জনসম্পৃক্ত বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু দৈনিক পত্র-পত্রিকা বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মূলত কখনও উন্নয়নমূলক বা কোনো ব্যক্তির সাফল্যের বিষয় উঠে আসে।

অবশ্য পত্রিকাগুলো কখনো কখনো পক্ষপাতমুক্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করে। তবে এখনো প্রতিবেদনগুলো তৈরি হয় প্রচলিত কাঠামো অনুসরণ করে। এখনো বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ-প্রতিবেদন তৈরি করা হয় কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর। যার আদল অনেকটাই বস্তুনিষ্ঠ। কোনো ঘটনা সংগঠিত হওয়ার পূর্বে বা যে সমস্যাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি সংগঠিত হলো; জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে কীভাবে ঘটনাটির সমাধান করা যায় সংবাদপত্রে এ বিষয়ে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না। গ্রামপ্রধান এদেশের একেক অঞ্চলে রয়েছে একেক সমস্যা। আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত ও উন্নয়ন এসব সমস্যা সমাধানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। অথচ আমাদের দেশের সাংবাদিকতায় প্রান্তিক বিষয়ে প্রতিবেদন করার প্রবণতা কম। প্রান্তবর্তী মানুষদের সমস্যায় তাদের নিয়োজিত করে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় সে বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে প্রতিবেদন তৈরি করাই হবে আমাদের মূল কাজ।

শুরু থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় পত্রিকাগুলোর চরিত্র হচ্ছে ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোয় মফস্বল এবং গ্রামের সংবাদ ছাপানো। আর প্রায়ই পত্রিকাগুলো এর জন্য অর্ধেক বা তার কম পৃষ্ঠা বরাদ্দ রাখে। কখনো কখনো মফস্বল সংবাদ যে অর্ধেক পৃষ্ঠাকে ছাড়িয়ে যায় তা মূলত সেই সময়ে বা সেই দিনের বিজ্ঞাপনের অপ্রতুলতার কারণে। খেলাধুলা, বিনোদন প্রভৃতির মতো কম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের জন্য পত্রিকাগুলো প্রথম আর শেষ পৃষ্ঠার পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠাগুলো ব্যবহার করে। এসব পৃষ্ঠাকে রঙিন করে ছাপা হয়। অথচ মফস্বল সংবাদ ছাপা হয় সাদাকালো পৃষ্ঠায়। বেশির ভাগ সংবাদপত্রে মফস্বলের পাতা শুধুমাত্র তখনই রঙিন হয় যখন ওই পাতায় কোনো রঙিন বিজ্ঞাপন থাকে। এর ব্যতিক্রম নেই বললেই চলে। মফস্বলের খবরকে রঙিন করা বা সামনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠায় ছাপানোকে পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকরা এখনো অপচয়ই ভাবেন।

লক্ষ্য
যেকোনো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত ও সর্বতোভাবে সফল করার জন্য দেশের সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে সংবাদ তথা তথ্যের সমবন্টন প্রয়োজন। শহর, মফস্বল, গ্রাম নির্বিশেষে সকল অঞ্চলের মানুষদেরকে যেমন সমানভাবে সংবাদ জানানো জরুরি তেমনি তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংবাদের উপস্থাপনও হওয়া উচিত সাম্যনীতির ভিত্তিতে। সংবাদপত্রকে সমাজের সদস্যদের মতবিনিময় ও অভিন্ন সংকটের বিষয়গুলো আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাজের সব অংশের সমান উন্নয়নের জন্য নগর ও মফস্বল বা গ্রামের সংবাদ আরোহন ও উপস্থাপন প্রক্রিয়াকে করতে হবে বৈষম্যহীন।

সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজির প্রভাবে সংবাদ মাধ্যম যে চরিত্রের অধিকারী হয়েছে তাতে সাংবাদিকতার উন্নয়নের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বিজ্ঞাপন ও প্রকাশক-সম্পাদকদের পুঁজিবাদী চিন্তা-পদ্ধতি। অন্য আরো পুঁজিবাদী দেশের মতো বাংলাদেশের সংবাদপত্রও জনসাংবাদিকতাকে উপেক্ষা করে কর্পোরেট সাংবাদিকতার দিকে ধাবমান । কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিজ্ঞাপন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ায় পত্রিকাগুলো কর্পোরেট সংবাদের প্রতি অতিমাত্রায় মনোযোগী হয়ে উঠছে। কর্পোরেট কোম্পানির আনুকূল্যের প্রত্যাশায় জনমানুষের খবরকে পাশ কাটিয়ে পত্রিকাগুলো পুঁজিসংশ্লিষ্ট খবরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ফলে জনসাংবাদিকতার প্রসার-প্রক্রিয়া হয়ে পড়ছে স্থবির। বিজ্ঞাপন সর্বস্বতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার, মানহীন রিপোর্টিং, পুঁজিমুখীনতা, জনস্বার্থ বিমুখতা, বক্তব্যের প্রাধান্য এসবই হচ্ছে বাংলাদেশের প্রচলিত সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের গতিচিত্র। এই গতিচিত্রে জনসাংবাদিকতার উপস্থিতি ও ধারা অনুল্লেখ্য ও ক্ষীণ। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কর্মকা-গুলোর এরকম বাস্তবতায় জনসাংবাদিকতা চর্চার বিষয়টি খুবই জরুরি। একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে গণমাধ্যমের অবস্থাও কার্যকর হয় যদি সে সমাজের সকল শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ বাস করে গ্রামে। ফলে উন্নয়নের প্রশ্নে গ্রামের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধানের বিষয়গুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। আর এই লক্ষে কাজ করবে আমাদের অনলাইন সংবাদপত্র।
প্রায় সবশ্রেণীর সব পত্রিকাই শহুরে শ্রেণীর ফ্যাশন, খাবার, বিনোদন, খেলাধূলা, প্রভিৃতর জন্য আলাদা করে বিশেষ ফিচার ও প্রতিবেদন প্রভৃতি ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে। ক্ষুদ্র শহুরে শ্রেণীর তুলনায় বিশাল প্রান্তিক জনগোষ্টীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যর্থতাকে পত্রিকাগুলো কমই গুরুত্ব দেয়। প্রান্তিক মানুষদের যে কয়েকটি হাতেগোনা সংবাদ পত্রিকায় স্থান পায় তার মধ্যে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, নির্যাতন প্রভৃতির মতো দুর্ঘটনার আধিক্য সর্বদাই লক্ষণীয়। সাম্প্রতিক সময়েও এই চিত্রের তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। গ্রামের মানুষদের আরো অনেক সমস্যাই থেকে যায় অন্তরালে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা যেমন আছে সাফল্যও আছে তেমন। গ্রামের সাফল্যের সংবাদ হবার হার সমস্যার সংবাদ হবার হারের তুলনায় আরো নাজুক। অবশ্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়ন সাংবাদিকতার ধারণার প্রসার ঘটায় কিছু জাতীয় দৈনিক প্রান্তজনদের সাফল্যকে তুলে ধরছে। এতে এক ধরনের আশার ঝিলিক দেখা গেলেও এখনও সন্তোষ প্রকাশ করার কিছু নেই। এক ধরনের প্রতিযোগিতা আর কৌশলের কারণেই মূলত কয়েকটি পত্রিকা গ্রামের মানুষের সাফল্যকে প্রচার করছে।

পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার আর শেষ পৃষ্ঠায় নগরকেন্দ্রীক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি সংবাদ যে ট্রিটমেন্ট পায় গ্রামকেন্দ্রিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সে ট্রিটমেন্ট পায় না। খুব কম সময়ই গ্রাম সম্পর্কিত খবরকে শীর্ষ সংবাদ করা হয়। পত্রিকার সবচে গুরুত্বপুর্ণ এই পৃষ্ঠা দুটোর সিংহভাগ সংবাদ নগরকেন্দ্রিক। নগর সংবাদের আকার, আয়তন, ধরন এবং প্রকাশের স্থানের সাথে গ্রাম সংবাদের আকার, আয়তন, ধরন এবং প্রকাশের স্থানের পার্থক্য সুবিশাল। বাংলাদেশের সব চরিত্রের পত্রিকাতেই নগর সংবাদ ও গ্রাম সংবাদ দৃষ্টকটু রকমের ভারসাম্যহীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জনসাংবাদিতার প্রতি পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদকের অনীহা লক্ষণীয়। তাদের আগ্রহ বরং বিজ্ঞাপনের দিকেই বেশি। সব পত্রিকাই বিজ্ঞাপনের জন্য মুখিয়ে থাকে। এখন সাংবাদিকতার নতুন হুমকি বিজ্ঞাপন। শুধু জনসাংবাদিকতাই নয় বিজ্ঞাপনের আগ্রাসনে সকল ধরনের সংবাদের অস্তিত্বই হয়ে পড়ছে সংকটগ্রস্থ। তবে আগ্রাসী বিজ্ঞাপনের প্রথম খড়গটি পড়ে গ্রাম সংবাদের ওপর।
সুশাসন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, রাজনীতি, দুর্নীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সন্ত্রাস প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলোর সাথে গণমাধ্যম ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। বলা যায় গণমাধ্যম এগুলো চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে গণমাধ্যমের কাঠামো, প্রযুক্তি এবং দায়বদ্ধতার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। অথচ গণমাধ্যমের বর্তমান বাস্তবতা এই যুক্তির সাথে মেলে না বললেই চলে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মিডিয়ার কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যেখানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নেই, প্রতিনিধিত্ব নেই। এবং এসব গণমাধ্যমগুলোর মালিক পুঁজিপতি কর্পোরেশনগুলো। আর তার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মুনাফা অর্জন। যার ফলে তাদের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে সুযোগটাই বড় হয়ে ওঠে। আবার গণমাধ্যমগুলোকে মুনাফার জন্য বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর করতে হয়।

তাছাড়া গণমাধ্যমের অধিকাংশ ভোক্তা শহরের ধনিক শ্রেণী। ফলে বিজ্ঞাপনের শর্তপূরণ করতে গণমাধ্যমগুলো শহরের ধনিক শ্রেণীর কর্মকান্ডকে বেশি প্রাধান্য দেয় কারণ, জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য ভোক্তাদের খবরগুলো বেশি করে দিতে হয়। ফলে গ্রামের খবরগুলো হয়ে পড়ে উপেক্ষিত। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কর্মকান্ডগুলোর এরকম বাস্তবতায় গ্রামীণ সাংবাদিকতা চর্চার বিষয়টি খুবই জরুরি।
জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোতে গ্রাম সম্পর্কিত যে তথ্য থাকে সেগুলো গ্রামীণ জনগণের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তথ্যে গ্রামীণ জনগণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হলে ‘লেভেল অব চয়েস’ এবং ‘লেভেল অব দি ব্যাক’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ গ্রামের জনগণকে কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, আইন-শৃঙ্খলা, রাজনীতি, মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোতে প্রয়োজনীয় তথ্য যোগানোর মাধ্যমে হিসেবে গ্রামীণ সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অথচ বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা খুবই নাজুক। এমতাবস্থায় গ্রামীণ সাংবাদিকতার মাধ্যমে জনগণের তথ্য-চাহিদা অনেকখানি পূরণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সংবাদতারা জনগণের চাহিদার সাথে মিল রেখে বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের গণমাধ্যমগুলোতে গতানুগতিক কাঠামোগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে।

তেমনি নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করতে চাই। সে লক্ষেই তৃণমূল নারীদেরকে সাংবাদিকতা পেশার জন্য আগ্রহী করে তুলতে চাই যাতে একেবাওে কাছ থেকে তারা নারীদেও কথ তুলে আনতে পারে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীর ক্ষমতায়নে যা কার্যকরী ভূমিকা রাখা সম্ভব। একই সঙ্গে আমরা শিশুদেরেকে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে চাই। যাতে ওরা ওদের অধিকার কথা ওরা বলতে পারে। শিল্প-সাহিত্যে ওরা চর্চার মাধ্যমে সত্যিকারের মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে।

বিষয়বস্তু
তৃণমূল সংবাদ/প্রান্তজনের কথা (ভূমি, চর দখল, নারীর ক্ষমতায়ন, শিশু অধিকার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংবাদ, শিশু উন্নয়ন, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের যাপিত জীবন। পানি ও পয়নিষ্কাশন, কুটির শিল্প, স্বাস্থ্যপাতা, উদ্বাস্তু, দলিত সম্প্রদায়, আদিবাসী, বস্তিবাসী, যৌনকর্মী, হিজরা সম্প্রদায়, অটিজম, পথশিশু, ভাসমান নারী, ভূমিহীন কৃষক, চর ও দীপাঞ্চল, বেদে, মানতা)
নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্ন্য়ন, সাংবাদিকতা পেশায় নারীকে উদ্ভুদ্দকরণ
শিশু সাংবাদিক তৈরি ও উন্নয়ন
সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানোন্য়ন
খেলাধুলা
বিনোদন
পর্যটন
বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি
শিল্প-সাহিত্য
ফ্যাশন
কৃষি
শেয়ার বাজার
বিদেশ
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা (বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে। তথ্য অধিকার আইন কে কাজে লাগিয়ে আমরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চর্চার করতে পারি। )

কার্যক্রম
ক. বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলায় সাংবাদিকদের সক্রিয়তা।
খ. ইস্যু নির্বাচন ও নিবিড় অনুসন্ধান।
গ. গ্রামীণ ও নগরের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ।
ঘ. বাস্তবতা বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্ট জনগণের অন্তর্ভুক্তি।
ঙ. তথ্য অনুসন্ধানে জরিপ।
চ. ফোকাস গ্রুপ আলোচনা।
ছ. সমস্যা সমাধানে দিকনির্দেশনা।
জ. পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ।
ঝ. সকল কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ফলোআপ প্রতিবেদনে গুরুত্বসহ বিবেচনা।
ঞ. তথ্য-উৎস সাধারণ ও সংশ্লিষ্ট লোকজন।
ট. ঘটনা বাস্তবতার মানবিক বর্ণনা।
ঠ. মানুষের নিজস্ব ভাষায়, ভঙ্গিতে, উচ্চারণে সত্যের পরিপূর্ণ উপস্থাপনা।
ড. ঘটনা-বাস্তবতার সাথে জড়িত লোকজনের কাছ থেকেই সমাধানের দিকনির্দেশনা।
ঢ. ঘটনার শিকার লোকজনের বঞ্চনা, অসহায়ত্ব অতিক্রম করার শক্তি, সাহস ও কৌশলের ওপর আলোকপাত।
ণ. সংবাদ-কাঠামো গড়ে উঠবে সাংবাদিকের নিজস্ব বার্তা প্রেরণের কৌশলের ওপর ভিত্তি করে।
ত. সংবাদ-কাহিনী একই সাথে বস্তুনিষ্ঠ এবং অধিযোগাযোগ মূলক হবে।
থ. গ্রাম ও নগরের মধ্যে সংবাদ পরিবেশনের যে পার্থক্য আছে তা কমিয়ে আনা।
দ. জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখা।